লেখক ঃ লিংক
****************
কলিগ + ছোটভাই Zilanur Rahman Shuvo এক মাস কোরিয়া থেকে ট্রেনিং করে আসছে। আমরা সবাই শুভকে ঘিরে বসলাম, কি কি শিখলো জানার জন্য...
শুভর প্রথম কথাই হলো...
" এভাবে হবে না ভাই, এভাবে হয় না... "
..........
ইন্সটিটিউট এ আসার পর থেকেই গত ৭ মাস ধরে বিশাল এক কর্মযজ্ঞের ছোট ছোট জিনিস নিয়া নাড়াচাড়া করছি, কখনো খুব ক্লান্ত লাগে, হতাশ লাগে... আমরা কি পারবো!!
আবার আশায় বুক বাঁধি... পারতেই হবে আমাদের...
সরকার যেহেতু ম্যানপাওয়ার ট্রেইন করার জন্য আলাদা ফান্ড দিবে না, আমরা নিজেরাই পরিচালক স্যারের পারমিশন নিয়ে গুতাগুতি আর খয়রাত করে এদিক ওদিক যাওয়ার চেষ্টা করতেছি...
শুভ গিয়েছিলো কোরিয়া। এক মাসে কোরিয়ার হেলথকেয়ার (খুব ই এক্সপেন্সিভ কিন্তু সিস্টেম টা অসাধারন) আর হেপাটোবিলিয়ারি সার্জারির এডভান্স প্রসিডিওর সম্পর্কে একটা ছোটখাটো আইডিয়া নিয়ে এসেছে। টেকনিক্যাল জিনিসটা আমরা পারবো না এমন কিছু না, কিন্তু সিস্টেম আমাদের কতটুকু সাপোর্ট কতোদিন দিতে পারবে সেটাই আসল।
****************
"গরীবের আবার থাকা, মাথায় কাপড় দিতে গেলে পাছা উদলা হইয়া যায়..."
ফজলুর রহমান বাবুর নাটকের ডায়ালগের মতো আমাদের স্বাস্থ্যখাতের একই দশা। পাছা ঢাকা জরুরি হলেও মাথার কাপড় মাঝে মাঝে উপেক্ষা করা যায় না। আমাদের স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসা থাকলেও সেবার বড় অভাব। এখানে হেলথ আছে মোটামুটি তবে সার্ভিস বড্ড কম। কারন সার্ভিস দিতে গেলে যে স্ট্যান্ডার্ড সেটাপ থাকার কথা সেটি আমাদের বর্তমান সিস্টেমে বড়ই উপেক্ষিত৷ হেলথ সার্ভিস মানেই কেবল ডাক্তার আর নার্সের উপস্থিতি নয়...
তার থেকেও বড় সমস্যা আপনার স্কিল আর নলেজের তুলনায় অপর্যাপ্ত বেতন। সারা পৃথিবীতেই যেখানে স্কিলড ম্যানপাওয়ার এর স্যালারি বেশি আমাদের সেখানে দুধ আর পানির একই দর। সেইটা পোষাতে গিয়ে ডাক্তারেরা পান অফিস টাইমের পরে প্রাইভেট প্রাকটিস এর অনুমতি, শিক্ষকেরা পান প্রাইভেট পড়ানোর অনুমতি, কেউ পান কনসাল্টেন্সির অনুমতি...
কিন্তু আমার ভীষন ক্লান্ত লাগে। সকালে একটা হুইপলস প্রসিডিওর করে আমার বিকেলে চেম্বারে যেতে ভালো লাগে না, সন্ধায় আবার ওটি করতে ইচ্ছা হয় না । আমার ইচ্ছা হয় বিকেলে রমনা পার্কে হাঁটাহাঁটি করে সন্ধায় বেইলি রোডে বউ বাচ্চার সাথে স্ট্রিট ফুড খেয়ে ১০ টার মধ্যে শুয়ে পড়তে, যেনো পরদিন আবার আমার ১০০% দিতে পারি।
বিশ্বাস করেন, পৃথিবীর মোটামুটি সিস্টেমে চলা সব দেশে এটাই বাস্তব। কোরিয়াতে ৫ টার পরে সব কনসালটেন্ট বাসায়, উইকএন্ডে পিকনিক বা হাইকিং এ...
এই কথা শুনে অনেকেই বলবেন যে আমরাও চাই আপনারা প্রাইভেট প্রাকটিস না করেন- কিন্তু ভাই কোরিয়ার সমান না হোক, খেয়ে পরে ভালোমতো চলার মতো একটা স্ট্যান্ডার্ড স্যালারি তো তার হাইলি স্কিলড জনবলের জন্য ন্যুনতম চাহিদা...
অনেকেই বলেন কই- অন্য ক্যাডারের তো একই বেতন, আর্মির ও...
কিন্তু আসল টুইস্ট হলো বেতন একই হলেও ফ্যাসিলিটি একই না। একজনের যেখানে বিভিন্ন ফ্যাসিলিটির কারনে বাসা-রেশন-ট্রান্সপোর্ট-হেল্পিং হ্যান্ড থাকায় বেতনে মোটামুটি চলে যেতে পারে- আমার শুন্য সুবিধার চাকরিতে সেটি বিলাসিতা। আমার বেতন মাসের ৫ তারিখেই শেষ...
##########
টয়োটা এক্সিও আর ল্যাম্বরগিনি ফর্মুলা ওয়ান কারের পার্থক্যটা হলো টয়োটা দিয়ে আপনার ডেইলি কাজ চলে যাবে, কিন্ত ল্যাম্বরগিনি আপনাকে রেস জেতাবে। ল্যাম্বরগিনি তেল খায় বেশি, মেইনটেইন করা লাগে বেশি রেসের পরে আবার রেস্ট ও দেওয়া লাগে বেশি। তারপরেও রেসের সার্কিটে মানুষ ল্যাম্বরগিনি ই চায়...
হেলথ সার্ভিসেও যদি আপনি আসলে প্রিমিয়াম সার্ভিস দিতে চান- আপনাকে কিছু ল্যাম্বরগিনি পালতে হবে। সে বেশি তেল খাবে- অনেক মেইনটেনেন্স চাবে, পড়ে পড়ে ঘুমাবে-- কিন্তু দিনশেষে রেস ও জেতাবে...
*************
আমাদের হেলথ সার্ভিসে সেই ল্যাম্বরগিনি হওয়ার কথা ছিলো সুপারস্পেশালাইজড হাসপাতাল। কিন্তু সেটার শুরুতেই বাঁশ মেরে দেওয়া হয়েছে এর প্রস্তাবিত আধুনিক বেতন কাঠামো কেটে দিয়ে। সেই বেতন কাঠামোতে ছিলো মোটামুটি খেয়ে পরে থাকার নিশ্চয়তা। মেডিকেল অফিসার ৭০ হাজার, কনসালটেন্ট ২-৩ লাখ, সিনিয়র/চীফ কনসাল্টেন্ট ৪-৫ লাখ ফুলটাইম নন প্রাকটিসিং চাকরির জন্য কোনমতে তাও চলে।
কিন্তু সবজান্তারা সেই স্কেল কেটে সরকারী স্কেল করে দিলো। সেইসাথে মেরে ফেললো এটি সত্যিকারের সুপারস্পেশালাইজড হাসপাতাল হওয়ার সম্ভাবনা। এটির কপালে এই বেতনে সদর হাসপাতালের উন্নত ভার্সন ছাড়া আমি কোন গতি দেখি না...
হুন্দাইয়ের বিল্ডিং, স্যামসাং এর ফিটিংস, লেনোভোর আইটি নিয়ে যার ল্যাম্বরগিনির হবার কথা,একটু বেশি বেতনের অপরাধে তাকে টয়োটা এক্সিও বানানো আমি মানতে পারিনা....
************
আসলে এভাবে হবে না
এভাবে হয় না...
উন্নত চিকিৎসা সেবা শুধু ডাক্তার দিয়ে হবে না, তাকে যুদ্ধ কবার মত ঢাল, তলোয়ার দিতে হবে ।